পাইলস কেন হয় – Why Do Piles Occur

Published On: December 14, 2025
পাইলস কেন হয় - Why Do Piles Occur

পাইলস (Piles) বা অর্শ রোগ বর্তমান সময়ে একটি খুবই সাধারণ কিন্তু কষ্টদায়ক সমস্যা। জীবনযাত্রার অনিয়ম, খাদ্যাভ্যাসের ভুল ও দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য এই রোগের প্রধান কারণ। অনেকেই লজ্জা বা ভয়ে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নেন না, ফলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এই আর্টিকেলে আমরা জানবো পাইলস কেন হয়, কী কী কারণে পাইলস হয় এবং প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কীভাবে পাইলস দমন করা যায়।

পাইলস কী? (What is Piles)

পাইলস বা অর্শ রোগ হলো মলদ্বার (anus) ও পায়ুপথের ভেতর বা বাইরের শিরা (রক্তনালি) অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া বা প্রসারিত হওয়ার একটি সমস্যা। এই ফোলা শিরাগুলোতে চাপ পড়লে ব্যথা, জ্বালা, রক্তপাত ও অস্বস্তি তৈরি হয়।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পায়ুপথের রক্তনালিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে যখন সেগুলো ফুলে যায়, তখনই পাইলস হয়।

পাইলস কত প্রকার?

পাইলস সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে—

১. ইন্টারনাল পাইলস (Internal Piles)

  • মলদ্বারের ভেতরে হয়
  • সাধারণত ব্যথা হয় না
  • মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত হয়

২. এক্সটারনাল পাইলস (External Piles)

  • মলদ্বারের বাইরে হয়
  • ব্যথা, জ্বালা ও চুলকানি বেশি হয়
  • বাইরে গুটি বা ফোলা অংশ দেখা যায়

পাইলস কেন হয়? (Why Piles Occur)

পাইলস (অর্শ রোগ) মূলত মলদ্বার ও পায়ুপথের রক্তনালিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে হয়। এই চাপ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে শিরাগুলো ফুলে যায়, দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাইলসের সৃষ্টি হয়।

নিচে সহজ ও পরিষ্কারভাবে পাইলস হওয়ার প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো—

১. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য

কঠিন মল ত্যাগের সময় অতিরিক্ত জোর দিলে পায়ুপথের শিরায় চাপ পড়ে, যা পাইলসের সবচেয়ে বড় কারণ।

২. আঁশযুক্ত খাবারের অভাব

ফল, শাকসবজি ও ফাইবার কম খেলে হজম ঠিক থাকে না এবং মল শক্ত হয়ে যায়, ফলে পাইলস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

৩. দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা

মোবাইল ব্যবহার করে বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি সময় টয়লেটে বসে থাকলে পায়ুপথে চাপ বৃদ্ধি পায়।

৪. অনিয়মিত জীবনযাপন

ব্যায়ামের অভাব, দেরিতে ঘুমানো ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ পাইলসের সম্ভাবনা বাড়ায়।

৫. গর্ভাবস্থা ও প্রসবকাল

গর্ভাবস্থায় জরায়ুর অতিরিক্ত চাপ এবং হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারীর পাইলস দেখা দেয়।

৬. অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা

ওজন বেশি হলে পেটের ভেতরে চাপ বেড়ে যায়, যা পাইলসের কারণ হতে পারে।

৭. ভারী জিনিস তোলা

নিয়মিত ভারী কাজ বা ওজন তোলার ফলে পায়ুপথের শিরায় চাপ পড়ে।

৮. বংশগত কারণ

পরিবারে কারো পাইলস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে।

প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পাইলস দমন করার উপায়

(Natural Ways to Control Piles)

পাইলস বা অর্শ রোগ প্রাথমিক অবস্থায় থাকলে প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ওষুধ বা অপারেশনের আগে জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস ঠিক করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

নিচে সহজ, নিরাপদ ও প্রমাণিত প্রাকৃতিক উপায়গুলো তুলে ধরা হলো—

১. আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান

ফাইবার বা আঁশ মল নরম করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

খাবার তালিকায় রাখুন—

  • পেঁপে
  • কলা
  • আপেল
  • ওটস
  • লাল শাক, পালং শাক
  • ডাল ও বাদাম

👉 প্রতিদিন ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার পাইলস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

প্রতিদিন ৮–১০ গ্লাস পানি পান করলে মল নরম থাকে এবং মলত্যাগ সহজ হয়।

👉 সকালে খালি পেটে ১–২ গ্লাস কুসুম গরম পানি খুব উপকারী।

৩. ইসবগুলের ভুষি সেবন

ইসবগুল একটি প্রাকৃতিক ল্যাক্সেটিভ।

ব্যবহার পদ্ধতি:

  • রাতে ঘুমানোর আগে ১–২ চা চামচ ইসবগুল
  • কুসুম গরম পানি বা দুধের সঙ্গে

👉 এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমিয়ে পাইলসের ব্যথা ও রক্তপাত হ্রাস করে।

৪. কুসুম গরম পানিতে বসা (Sitz Bath)

দিনে ২ বার ১০–১৫ মিনিট কুসুম গরম পানিতে বসলে—

  • ব্যথা কমে
  • ফোলা ও জ্বালা হ্রাস পায়
  • রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়

৫. নারিকেল তেল বা অ্যালোভেরা ব্যবহার

এক্সটারনাল পাইলসে প্রাকৃতিকভাবে আরাম দেয়।

  • নারিকেল তেল বা অ্যালোভেরা জেল
  • দিনে ২ বার পরিষ্কার স্থানে লাগান

👉 চুলকানি ও জ্বালা কমে।

৬. নিয়মিত হাঁটা ও হালকা ব্যায়াম

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা হজম শক্তিশালী করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

👉 দীর্ঘ সময় বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।

৭. মল চেপে রাখা বন্ধ করুন

প্রাকৃতিক ডাকে দেরি করলে মল শক্ত হয় এবং পাইলস বাড়ে।

👉 চাপ দিয়ে মলত্যাগ করা থেকে বিরত থাকুন।

৮. মসলাযুক্ত ও ভাজা খাবার কমান

ঝাল, ভাজা ও ফাস্টফুড পাইলসের জ্বালা বাড়ায়।

এড়িয়ে চলুন—

  • অতিরিক্ত মরিচ
  • ভাজাপোড়া
  • জাঙ্ক ফুড
  • অ্যালকোহল

৯. নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময়ে টয়লেট করুন

প্রতিদিন একই সময়ে টয়লেটে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

👉 এতে শরীরের প্রাকৃতিক রুটিন ঠিক থাকে।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ জরুরি?

  • অতিরিক্ত রক্তপাত হলে
  • তীব্র ব্যথা থাকলে
  • প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ৭–১০ দিনে উন্নতি না হলে

উপসংহার – আমার মন্তব্য

পাইলস কোনো ভয়ংকর রোগ নয়, তবে অবহেলা করলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপারেশন ছাড়াই পাইলস দমন করা সম্ভব। শুরুতেই সচেতন হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়।

পাইলস কি মারাত্মক রোগ?

না, পাইলস মারাত্মক রোগ নয়। তবে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত ও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

পাইলস কি নিজে নিজে ভালো হয়?

প্রাথমিক অবস্থায় খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন ঠিক করলে অনেক সময় নিজে থেকেই ভালো হয়। তবে গুরুতর হলে চিকিৎসা প্রয়োজন।

পাইলস হলে কি রক্তপাত হয়?

হ্যাঁ, বিশেষ করে ইন্টারনাল পাইলসে মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত হয়।

পাইলস কি অপারেশন ছাড়া ভালো করা যায়?

হ্যাঁ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পদ্ধতি, ওষুধ ও জীবনযাপন পরিবর্তনের মাধ্যমে অপারেশন ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

পাইলস হলে কোন খাবার খাওয়া উচিত?

ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার যেমন—
শাকসবজি
ফলমূল
ডাল
ইসবগুল
পর্যাপ্ত পানি

পাইলস কি আবার ফিরে আসতে পারে?

হ্যাঁ, ভুল খাদ্যাভ্যাস ও কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে পাইলস পুনরায় হতে পারে।

---Advertisement---

Leave a Comment